Sunday, October 10, 2010

speech of Swami Vivekananda



প্রতিমা পুজা সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের বক্তব্য (১৮৯৩ সালে চিকাগো ধর্মসম্মেলনে স্বামীজির দেওয়া বক্তৃতার একাংশ বাংলায় অনূদিত)
by Biswas Anupam on Sunday, 10 October 2010 at 13:21


Swami Vivekananda
প্রথমে আমি বলে রাখি যে ভারতবর্ষে বহু ইশ্বারবাদ নাই । প্রতি দেবালয়ের পার্শ্বে দাড়াইয়া যদি কেহ শ্রবন করেন ,তাহা হইলে তিনি শুনবেন যে পূজক দেববিগ্রহে ইশ্বর এর সমুদয় গুন ---এমনকি সর্বব্যাপিত্ব পর্যন্ত আরোপ করিতেছেন । ইহাকে বহু ইশ্বরবাদ বা কোনো দেব বিশেষের প্রাধান্যবাদ প্রভৃতি কোনোবাদই বলা চলে না।গোলাপ কে যে নাম ই দাও না কেন, তাহাতে তাহার গন্ধের কোনো হানি হইবে না,কোনো একটি নাম দিলে ই যে জিনিসটা ঠিক বোঝানো গেল তাহা ও নহে।

বাল্যকালে আমি একদা এক খ্রীষ্টান পাদ্রিকে কতকগুলি লোকের সম্মুখে ধর্ম সম্মন্ধে বক্তৃতা করিতে শুনিয়াছিলাম। নানাবিধ মধুর কাথা বলিতে বলিতে তিনি বলিয়া উঠিলেন , আমি যদি তোমার ঠাকুরকে এই লাঠির খোচাটা দিই,সে আমার কি করিতে পারে? জনতার মধ্য হইতে একজন বলিল ,আমি যদি তোমার ভগবানকে গালাগালি দিই,উহা আমার কি করিতে পারে?পাদ্রি উত্তর করিলেন,মৃত্যুর পর তোমার শ্বাস্তি হইবে।সেই ব্যাক্তি কহিল,তুমি মরিলে পর আমার দেবতা ও তোমাকে বিধিমত পুরষ্কার দিবেন । ফলেই বৃক্ষের পরিচয়। যখন দেখি যাহাদিগকে পৌত্তলিক বলা হয়,তাহাদের মধ্যে এমন মানুষ আছেন যাহাদের মত নীতিজ্ঞান,আধ্যাত্যিকতা ও প্রেম কখন কোথাও দেখি নাই,তখন মনে এই প্রশ্ন উদিত হয় পাপ হইতে কি কখন ও পবিত্রতা জন্মিতে পারে?

কুসংকার মানুষের শত্রু বটে,কিন্তু ধর্মান্ধতা আরো খারাপ।খ্রীষ্টানরা কেন গীর্জায় যান?ক্রুশইবা এত পবিত্র কেন?প্রার্থনার সময় আকাশের দিকে তাকানো হয় কেন?ক্যাথলিকদের গির্জায় এত মুর্তি রহিয়াছে কেন?প্রোটেস্টান্টদের মনে প্রার্থনাকালে এত ভাবময় রুপের আবির্ভাব হয় কেন?হে আমার ভ্রাতৃবৃন্দ, নিঃশ্বাস গ্রহন না করিয়া জীবন ধারন যেমন অসম্ভব,চিন্তাকালে মনোময় রুপবিশেষের সাহায্য না লওয়াও আমাদের পক্ষে সেইরুপ অসম্ভব।ভাবপরম্পরানুক্রমে জড়মুর্তি দেখিলে মানসিক ভাবঅবিষেশের উদ্দীপন হয়,বিপরীতক্রমে মনে ভাব বিশেষের উদ্দীপন হইলে,তদনুরুপ মূর্তিবিশেষও মনে উদিত হয়।এইজন্য হিন্দু উপাসনার সময়ে বাহ্য প্রতীক ব্যবহার করে।
সে বলিবে তার উপাস্য দেবতায় মন স্থির করিতে প্রতীক সাহায্য করে।সে তোমাদের মতই জানে, প্রতীমা ঈশ্বর নয়,সর্বব্যাপী নয় আচছা বলতো সর্বব্যাপী বলতে অধিকাংশ মানুষ ----প্রকৃতপক্ষে সারা পৃথিবীর মানুষ কি বুঝিয়া থাকেন?ইহা এক্ টি শব্দ মাত্র...একটি প্রতীক।ঈশ্বরএর কি বিস্তৃতি আছে ? তা যদি না থাকে, তবে সর্বব্যাপী শব্দটি আবৃত্তি করিলে, আমাদের মনে বড়জোর বিস্তৃত আকাশ অথবা মহাশুন্যের কথা উদিত হয়, এই পর্যন্ত ।

অতএব, যেমন মানুষের স্বভাবই এই যে তাহার অন্তরের ভাবোপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনন্ত নীলাকাশ বা অপার সমুদ্র আপনা-আপনি মনে আসিয়া পড়ে এবং যেমন কেহ কেহ সর্বব্যাপীত্ব ও পবিত্রতার ভাব স্ব স্ব স্বভাব অনুসারে গির্জাঘর মসজিদ বা ক্রুশের সহিত সম্মিলিত করিয়া রাখেন,সেইরুপ হিন্দুরা পবিত্রতা, নিত্যত্ব,সর্বব্যাপীত্ব প্রভৃতি ভাবগুলিকে নানারুপ দেববিগ্রহে সম্মিলিত করিয়া রাখিয়াছেন তবে প্রভেদ এইটুকু যে , কেহ কেহ সমস্ত জীবন স্বীয় ধর্মসম্প্রদায়ের গন্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থাকিয়া আপনাদের উন্নতির পথে কন্টক দিয়াছেন।কারন তাহাদের ধর্ম কতিপয় মতের পোষকতা করা আর লোকের উপকার করা ভিন্ন আর কিছুই নহে।কিন্তু হিন্দুর সমগ্র ধর্মভাব অপরক্ষানুভূতিতেই কেন্দ্রিভূত।মানবকে ঈস্বরোপলব্ধি দ্বারা স্ব্য়ং ঈস্বরকে প্রাপ্ত হইতে হইবে। সুতরাং দেববিগ্রহই হউক, দেবালয়ই হউক বা ধর্মশাস্ত্রই হউক,এই সমুদয় তাহার ধর্মজীবনের বাল্যাবস্থার সহকারী মাত্র, এ সকল তাহার চরম উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নহে।

তাহাকে ক্রমাগত আগাইয়া যাইতে হইবে,কোথাও থামিলে চলিবে না।বাহ্যপুজা,মুর্তিপুজা প্রথমাবস্থার কার্য,পরে কিঞ্চিত উন্নত হইলে মানসিক প্রার্থনা,কিন্তু ঈস্বর সাক্ষাৎকারই সর্বোৎকৃষ্ট এবং চরম অবস্থা।-----হিন্দুশাস্ত্র ইহাই বলিতেছে।যে ধর্মপিপাসু ব্যক্তি কিছুকাল পুর্বে করজোড়ে জানু পাতিয়া দেববিগ্রহের সম্মুখে পুজায় বসিয়া থাকিতেন, শোনো জ্ঞান লাভের পর তিনি কি বলিতেছেন-----" সূর্য তাহাকে প্রকাশ করিতে পারে না,চন্দ্র তারা আর এই সমুদয় বিদ্যুৎ ও তাহার প্রকাশক নহে,সুতরাং অগ্নি তাহাকে কিরুপে প্রকাশ করিবেন?ইহারা সকলে তাহারই আলোকে প্রকাশিত।'' কিন্তু এক্ষণে তাহার বাহ্য-পূজা ত্যাগ হইয়া গিয়াছে বলিয়া ভিন্নধর্মীদের ন্যায় বিগ্রহসেবাকে তিনি পাপজনক বলিয়া ঘৃণা করেন না।তিনি ইহাকে তাহার জীবনের এক অত্যাবশ্যক অবস্থা বলিয়া বুঝিয়া থাকেন।
বাল্য ্যৌবনাদির জন্মদাতা ।বৃদ্ধ যদি বাল্য ও যৌবনাস্থাকে পাপের অবস্থা বলিয়া ঘৃণা করেন,তাহা হইলে কি তিনি হাস্যাস্পদ হইবেন না?

হিন্দু ধর্মে বিগ্রহপূজা যে সকলের অবশ্য কর্ত্যব্য তাহা নহে।কিন্তু কেহ যদি বিগ্রহের সাহায্যে সহজে নিজের দিব্যভাব উপলব্ধি করতে পারে,তাহা হইলে কি উহাকে পাপ বলা সঙ্গত?সাধক যখন ঐ অবস্থা অতিক্রম করিয়া গিয়াছেন,তখন ও তাহার পক্ষে উহা ভূল বলা সঙ্গত নহে।হিন্দুর দৃষ্টিতে মানুষ ভ্রম হইতে সত্যে গমন করে না, পরন্তু সত্য হইতে সত্যে,নিম্নতর সত্য হইতে উচ্চতর সত্যে উপনীত হইতেছে।

হিন্দুর নিকট নিম্নতর জড়োপাসনা হইতে বেদান্তের অদৈতবাদ পর্যন্ত সাধনার অর্থ অসীমকে ধরিবার----উপলব্ধি করিবার জন্য মানবাত্মার বিবিধ প্রচেষ্টা।জন্ম,সঙ্গ ও পরিবেশ অনুযায়ী প্রত্যেকের সাধন প্রচেষ্টা নিরুপিত হয়।প্রত্যেকটি সাধনাই ক্রমন্নতির অবস্থা।প্রত্যেক মানবাত্মাই ঈগলপক্ষীর শাবকের ন্যায় ক্রমশ উচ্চ হইতে উচ্চস্তরে উঠিতে থাকে এবং ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করিয়া শেষে সেই মহান সূর্যে উপনীত হয়।
বহুত্বের মধ্যে একত্বই প্রকৃতির নিয়ম,হিন্দুগন ইহা উপলব্ধি করিয়াছেন।অন্যান্য ধর্ম কতগুলি নয়ম বিধিবদ্ধ করিয়া সমগ্র সমাজকে বল্পূর্বক সেগুলি মানাইবার চেষ্টা করে । সমাজের সম্মুখে তাহারা একমাপের জামা রাখিয়া দেয়।।জ্যাক,জন,হেনরি প্রভৃতি সকলকেই ঐ একমাপের জামা পরিতে হইবে।জদি জন বা হেনরির হায়ে উহা না লাগে তবে তাহাকে জামা না পরিয়া থাকিতে হইবে।

হিন্দুগন আবিষ্কার করিয়াছেন-----আপেক্ষিকতাকে আশ্রয় সারিয়াই নিরপেক্ষ পরম তত্ত্বচিন্তা উপলব্ধি বা প্রকাশ করা সম্ভব এবং প্রতিমা ,ক্রুশ বা চন্দ্রকলা প্রতীক মাত্র,আধ্যাতিক ভাব প্রকাশ করিবার অবলম্বন স্বরুপ।এই প্রকার সাহায্য যে সকলের পক্ষে আবশ্যক তাহা নহে।তবে অধিকাংশ লোকের পক্ষেই এই প্রকার সাহায্য আবশ্যক।যাহাদের পক্ষে ইহা আবশ্যক নয়, তাহাদের বলিবার কিছুমাত্র অধিকার নাই যে ইহা অন্যায়।
আর একটি বিষয় বলা আমাদের অবশ্য কর্তব্য।হিন্দুধর্মে মূর্তিপুজা একটা ভয়ানক ব্যাপার নয়।ইহা দুষ্কর্মের প্রসূতি নয়।বরং ইহা দুর্বল অধিকারীদিগকে ধর্মের উচ্চভাব ধারন করিতে সক্ষম করে।হিন্দুদের অনেক দোষ আছে ।কিন্তু এইটি জানা উচিত যে,ইহা তাহাদের আত্মদেহপীড়নেই আবদ্ধ, অন্য ধর্মাবলম্বীদের শিরশ্ছেদনে বিস্তৃত নহে।

1 comment:

  1. buddy....is it available in ENGLISH....??!!!!

    ReplyDelete